অনুবাদ গল্প: এক ফোঁটা চোনা : ইটালো কালভিনো

অনুবাদ গল্প: এক ফোঁটা চোনা : ইটালো কালভিনো

একদা একটি দেশ ছিল যেখানে দেশের মানুষ সবাই চোর।

এই দেশে রাত হলেই সবাই কালো ঢাকনিতে ঢাকা লণ্ঠন আর কিছু রামচাবি হাতে বেরিয়ে পড়ে প্রতিবেশীর বাড়িতে চুরি করতে। ভোরে যখন সবাই চুরির মালে বোঝাই হয়ে বাড়ি ফেরে, তখন আবিষ্কার করে তাদের নিজেদের বাড়িও ততক্ষণে একেবারে ফকফকা।

তো এভাবেই সবাই মিলে মহাসুখে বসবাস করছিল। এখানে কেউ ঠকত না। কারন প্রত্যেকেই অন্যেরটা চুরি করত আর সেই অন্যজন আবার আরেক জনের কাছ থেকে, আর ঐ আরেক জন আবার আরও অন্য একজনের কাছে থেকে। এভাবেই চলতে থাকত দেশের শেষ লোকটি পর্যন্ত, যে কিনা দেখা যেত একেবারে প্রথম জনের কাছ থেকে চুরি করেছে। এই দেশে ব্যবসা-বানিজ্য মানেই ঠকাঠকি আর জালজোচ্চুরি -ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে উভয়কে ঠকাতো সেয়ানে সেয়ানে। দেশের সরকার ছিল একটা ক্রিমিনাল সংগঠন যারা কিনা নিজেদের নাগরকিদের পকেট কাটত। আর নাগরিকরাও কম ঘুঘু না – সরকারকে ঠকানো ছিল তাদের প্রিয় নেশা। তো, এভাবেই ঐ দেশের জনগনের জীবন নিশ্চিন্ত সুখে-শান্তিতে কেটে যেত। কেউ ধনী ছিল না, কিন্তু কেউ দরিদ্রও ছিল না সেখানে।

এমনি এক সময়, কিভাবে আমরা জানি না, ঐ দেশে একজন সৎ লোক বসবাস করতে আসলেন। দেখা গেল রাত্রি বেলা কাঁধে বস্তা ঝুলিয়ে আর হাতে লণ্ঠন নিয়ে বেরিয়ে পড়ার বদলে এই মানুষটা বাড়িতে বসে উপন্যাস পড়তেই বেশি পছন্দ করেন।

চোরেরা আসত, কিন্তু তার বাড়িতে আলো জ্বলতে দেখে আবার ফিরে যেত।

এইভাবে বেশ কিছুকাল চলল। কিন্তু একটা পর্যায়ে নিশিকুটুম্বের দল বাধ্য হল নবাগতকে বুঝিয়ে বলতে যে, তিনি যদি কাজকম্ম কিছু নাও করেন সেটা তার ব্যাপার। কিন্তু তাই বলে অন্যদের কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়ানোটা তার উচিৎ হচ্ছে না। একটি রাত তিনি নিজের বাড়িতে থাকা মানে হচ্ছে পরের দিন আরেকটি পরিবারকে উপোস দেয়া।

সৎ মানুষটি এহেন অকাট্য যুক্তির উপরে কোন কথাই বলতে পারলেন না। ফলে এরপর থেকে প্রতি সন্ধ্যায় তিনিও বেরুতে শুরু করলেন এবং অন্য সবার মতই বাড়ি ফিরতে লাগলেন পরের দিন সকালে। কোনরকম চুরিধারি করা ছাড়াই। সৎ মানুষ বলে এ ছাড়া আর কোন উপায়ও ছিল না তার। উনি ব্রিজটা পর্যন্ত চলে যেতেন আর তার নীচে দিয়ে বয়ে যাওয়া জলপ্রবাহ দেখে দেখে সময়টা পার করে দিতেন। তারপর সকালে যখন বাড়ি ফিরতেন, তখন দেখতেন যথারীতি তার বাড়িতে ডাকাতি হয়ে গেছে।

এক হপ্তার মধ্যেই সৎ মানুষটি কপর্দকশুন্য হয়ে গেলেন। তার বাড়িতে দেয়াল ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকল না, আর ক্ষুধার অন্ন জোটানোও তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ল। অবশ্য এটা কোন সমস্যা না, কারন এটা তো তারই দোষ। না, সমস্যা যদি কিছু হয়ে থাকে – সেটা হলো তার আচরণ। এই আচরণ সব ব্যালেন্স নষ্ট করে দিল, গুবলেট করে দিল। তিনি নিজের যা ছিল সব অন্যদের চুরি করতে দিয়েছেন, অন্য কারও কাছ থেকে পালটা কিছু চুরি না করেই। ফলে সব সময়ই একজন না একজন লোক ভোর বেলা নিজের বাড়ি ফিরে দেখতে পেত তার বাড়ি কেঊ স্পর্শ করেনি – যে বাড়িতে কিনা হিসাব অনুযায়ী ঐ সৎ মানুষটার চুরি করার কথা ছিল।

যাই হোক, কিছুকাল পরে দেখা গেল যাদের বাড়িতে চুরি হয়নি তারা অন্যদের থেকে ধনী হয়ে গেছে। এখন আর তাদের চুরি করতে ইচ্ছে করে না। অবস্থা আরও খারাপ হল, যখন দেখা গেল সৎ মানুষটির বাড়িতে যারা চুরি করতে আসছে তাদের খালি হাতেই ফিরে যেতে হচ্ছে, কারন বাড়ি একদম খালি। ফলে এই চোরেরা দিনে দিনে গরিব হয়ে যেতে থাকল।

ইতিমধ্যে, যারা এর মধ্যেই ধনী হয়ে গেছে তাদেরকে ঐ সৎ মানুষটার অভ্যাস পেয়ে বসল। তারাও রাত্রি বেলা হাঁটতে হাঁটতে ব্রিজের উপরে গিয়ে তার নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির প্রবাহ দেখা শুরু করে দিল। এতে সমাজে সার্বিক বিভ্রান্তি আরও বেড়ে গেল। কারন এর ফলে আরও বহু লোক ধনী হয়ে গেল, এবং সেই সাথে আরও বহু লোক গরিবও হয়ে গেল।

এই অবস্থায় হলো কি, ধনী হয়ে ওঠা মানুষগুলি হঠাৎ করে টের পেল তারা যদি প্রতি রাতে ব্রিজে যায়, তাহলে তারা শিগ্‌গির ফতুর হয়ে যাবে। ভাবতে ভাবতে তাদের মাথায় হঠাৎ বিদ্যুৎ ঝিলিক দিল – “আরে, কিছু গরিবগুর্বোকে আমাদের হয়ে ডাকাতি করার জন্য পয়সা দিয়ে পুষলে কেমন হয়!”
ফলে তারা দস্তুরমত চুক্তি সম্পাদন করল, বেতন/কমিশন ইত্যাদি নির্ধারণ করল। অবশ্য স্বভাব যায় না মলে, কয়লা যায় না ধুলে – ফলে এর মধ্যেও তারা নিজেদের মধ্যে ঠকাঠকি করতে ছাড়ল না। কিন্তু যেমনটা হয় আর কি, ধনীরা আরও ধনী হতে থাকল আর গরিবরা আরও গরিব, আরও গরিব।
আস্তে আস্তে দেখা গেল, এইসব ধনীদের মধ্যে কিছু কিছু ধনী এতই ধনী হয়ে গেল যে, ধনী থাকার জন্য তাদের আর চুরি করা লাগে না বা অন্য কাউকে দিয়ে চুরি করানোও লাগে না। কিন্তু তারা যদি চুরি করা থামিয়ে দেয়, তাহলে তারা আবার গরিব হয়ে যাবে। কারন গরিবরা তো তাদের থেকে চুরি করতেই থাকবে। সুতরাং তারা গরিবস্য গরিবদের ভাড়া করা শুরু করল অন্য গরিবদের হাত থেকে নিজেদের ধনসম্পত্তি রক্ষার জন্য। এর থেকেই সৃষ্টি হল পুলিশ বাহিনি। নির্মিত হল কারাগার।

এভাবেই, সৎ মানুষটির আবির্ভাবের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই লোকজন চৌর্য্যবৃত্তি নিয়ে আলাপ করা ভুলে গেল। এখন তাদের আলাপের বিষয় শুধুই – ধনী আর দরিদ্র। তবে বলাই বাহুল্য – তারা চোর ছিল, চোরই থেকে গেল।

এই সবকিছুর মধ্যে একমাত্র সৎ মানুষ ছিলেন সেই প্রথম ব্যক্তিটি। তিনি অবশ্য খুব দ্রুতই মারা পড়েছিলেন। নিতান্তই অনাহারে।

Advertisements

One thought on “অনুবাদ গল্প: এক ফোঁটা চোনা : ইটালো কালভিনো

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s